মো: তারেক হোসেন
শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬। রমজানের পবিত্র আবহে আজ দেশের রাজনীতির দুটি ভিন্ন ধারার নেতাদের খুব কাছ থেকে দেখার সযোগ হলো। দিনটি শুরু হয়েছিল দেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি কর্মসূচি দিয়ে, আর শেষ হলো ইফতারের টেবিলে বিরোধী শিবিরের অন্যতম নেতা জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে। একই দিনে রাজনীতির দুই মেরুর দুই শীর্ষ ব্যক্তিত্বকে এত কাছ থেকে দেখা এবং তাদের কথা শোনার অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই মনে কিছু গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একজন সংবাদকর্মী বা সচেতন নাগরিক হিসেবে যখন আমরা নেতাদের খুব কাছ থেকে দেখি, তখন কেবল তাদের রাজনৈতিক পরিচয়টিই প্রধান থাকে না; বরং মানুষ হিসেবে তাদের আচরণ, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং দূরদর্শিতাও আমাদের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে। আজকের এই অভিজ্ঞতার নির্যাস থেকে বাংলাদেশের আগামীর পথচলা নিয়ে কিছু ভাবনা ডায়েরির পাতায় উঠে এলো।
প্রথমেই আসা যাক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রসঙ্গে। দীর্ঘদিন পর দেশের শাসনভারের কেন্দ্রে থেকে তিনি যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তাতে আধুনিকমনস্কতার ছোঁয়া স্পষ্ট। তবে একটি দেশের প্রকৃত শক্তি কেবল তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নয়, বরং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনীতিতেও নিহিত থাকে। এই জায়গাটায় বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম ‘সার্ক’ (SAARC) গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কার্যত মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে আছে। অথচ এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা এবং কানেক্টিভিটির জন্য সার্কের চেয়ে কার্যকর কোনো বিকল্প নেই। আজ যখন প্রধানমন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখলাম, তখন মনে হলো—এই স্থবিরতা কাটানোর চাবিকাঠি এখন তাঁর হাতে। বাংলাদেশ যদি সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য একটি সাহসী ও কার্যকর উদ্যোগ নেয়, তবে তা কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের বন্ধুত্বের হাতকেই শক্তিশালী করবে না, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নেতৃত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। কূটনীতির এই দাবার চালে বাংলাদেশ যদি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে, তবে তা আমাদের টেকসই উন্নয়নের পথকে আরও মসৃণ করবে। তারেক রহমানের নেতৃত্বের সামনে এটি এখন সময়ের এক বড় দাবি।
অন্যদিকে, দিনের শেষে ইফতারের মুহূর্তে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে আলাপের সুযোগটি ছিল একদম ভিন্ন মেজাজের। বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির একটি দীর্ঘ ইতিহাস ও শক্ত ভিত্তি রয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরে থেকে এই রাজনীতি চর্চা করা যেমন নাগরিক অধিকার, তেমনি সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারার রাজনীতিতে কোনো গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন কি না—সেই প্রশ্নটিও এখন সামনে আসছে। জামায়াতের আমিরের প্রতি আমার একটি বিনীত চিন্তার খোরাক হলো—দাওয়াত ও সরকার গঠনের রাজনীতি কি আলাদা করা সম্ভব? ইসলাম যে নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং কল্যাণের কথা বলে, তা কেবল নির্বাচনের লড়াইয়ে জেতার মাধ্যমেই অর্জন করতে হবে এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একটি সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সামাজিক আন্দোলনের যে বিশাল ক্ষেত্র পড়ে আছে, সেখানে কি নতুন করে ভাবার সুযোগ নেই? সরাসরি ক্ষমতার রাজনীতি অনেক সময় আদর্শিক প্রচারণাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। যদি আদর্শ প্রচার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশলকে দুটি ভিন্ন সমান্তরাল পথে চালানো যায়, তবে হয়তো সমাজে ইসলামের মানবিক আবেদন আরও সর্বজনীন হতে পারে। জামায়াতকে নিয়ে সাধারণ মানুষের যে বিচিত্র কৌতূহল বা ভিন্নমত রয়েছে, তা নিরসনে এই নতুন ধারার চিন্তা একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
রাজনীতির এই দুই ভিন্ন ধারাকে একদিনে পর্যবেক্ষণ করে যে সত্যটি বারবার মনে উঁকি দিচ্ছে, তা হলো সংলাপের প্রয়োজনীয়তা। আজকের দিনে আমাদের সবচেয়ে বড় অভাব হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আলোচনার পরিবেশ। একজন প্রধানমন্ত্রী এবং একজন শীর্ষ বিরোধী নেতার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পার্থক্যের ভেতরেও যদি দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কোনো সাধারণ বিন্দু খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয় না। স্থিতিশীলতা কেবল আইন দিয়ে নয়, বরং রাজনৈতিক সহনশীলতা দিয়ে আসে। তারেক রহমানের উন্নয়ন ভাবনা এবং ডা. শফিকুর রহমানের সমাজ সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা—এই দুইয়ের মাঝে যদি কোনো জাতীয় ঐকমত্যের জায়গা তৈরি করা যায়, তবে ২০২৬ সালের বাংলাদেশ সত্যিই এক নতুন দিগন্তের দেখা পাবে।
আমাদের মনে রাখা দরকার, রাজনীতি কোনো শেষ গন্তব্য নয়, বরং এটি মানুষের সেবা করার একটি মাধ্যম মাত্র। আজকের এই দুটি বিশেষ সাক্ষাৎ থেকে আমার এটাই মনে হয়েছে যে, প্রত্যেকের ভেতরেই দেশ নিয়ে নিজস্ব পরিকল্পনা আছে। কিন্তু সেই পরিকল্পনাগুলো যখন কেবল দলীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তা সার্বিক জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না। তারেক রহমানের হাত ধরে সার্কের পুনর্জন্ম আর জামায়াতের আমিরের হাত ধরে ইসলামী রাজনীতির আধুনিক ও মানবিক বিবর্তন—এই দুটি বিষয়ই বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার জন্য নিয়ামক হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা কি পুরোনো তিক্ততা নিয়ে পড়ে থাকব, নাকি নতুন চিন্তার ডানা মেলে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব? প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী নেতাদের আজকের তৎপরতা অন্তত এই আশাটুকু জাগিয়ে রাখে যে, পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। এখন শুধু প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে গঠনমূলক সমালোচনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। আজকের এই অভিজ্ঞতার রেশ ধরে যদি আমাদের নেতারা একটু ভিন্নভাবে ভাবতে শুরু করেন, তবে আজকের এই বসন্তের দিনটি কেবল ইতিহাসের পাতায় নয়, বরং মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের পাতাতেও উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
