আজিজুল হাকিম রাকিব: হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। সরকার ও প্রশাসন নিয়মিতই দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে এবং সাধারণ মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি নিরাপদ বলে দাবি করছে। সরকারি বিবৃতিতে প্রতিনিয়তই বলা হচ্ছে যে, দেশজুড়ে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, গণমাধ্যমের খবর, এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রকমের অবনতির দিকে যাচ্ছে।
প্রথমত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এখনো কাটেনি। ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকে যেভাবে সড়কে সহিংসতা, দলীয় কোন্দল এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তার বেড়েছে, তা জননিরাপত্তাকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। অনেক অঞ্চলে এখনও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নিয়মিত সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা আইনকে তোয়াক্কা না করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করছে।
দ্বিতীয়ত, সারাদেশে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে গেছে। চুরি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ কিংবা সাইবার অপরাধ—সবক্ষেত্রেই অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। রাতের অন্ধকারে কিংবা দিনের বেলায়ই মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। নগর জীবনে চুরি, ছিনতাই এবং ডাকাতির মতো ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অথচ প্রশাসন এগুলোকে “অল্প কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা” বলে আখ্যা দিচ্ছে।
তৃতীয়ত, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা দিন দিন তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। তারা জনগণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। যাদের দায়িত্ব জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে এখন পক্ষপাতিত্ব, দুর্নীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। অনেক ভুক্তভোগী থানায় গিয়ে ন্যায্য বিচার পাচ্ছেন না; বরং উল্টো হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আবার অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অপরাধীরা রক্ষা পাচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
চতুর্থত, সীমান্তবর্তী এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। মাদক পাচার, চোরাচালান কিংবা সীমান্ত হত্যা—সব মিলিয়ে জননিরাপত্তা দিনকে দিন দুর্বল হচ্ছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে শক্ত পদক্ষেপের ঘোষণা এলেও বাস্তবে খুব একটা পরিবর্তন ঘটছে না। ফলে দেশে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ এখন সরকারি ঘোষণার চেয়ে নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকেই বেশি বিশ্বাস করছে। মানুষ দেখছে—তাদের সন্তান বিদ্যালয়ে যেতে নিরাপদ নয়, ব্যবসায়ী দোকানপাটে নিরাপদ নয়, পথচারী রাস্তায় নিরাপদ নয়। এভাবে নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্তরে নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়ছে।
এ অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়া উচিত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দেশের রাজনৈতিক সমাধান, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন কিংবা কূটনৈতিক ভারসাম্য—সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি মৌলিক সত্য হলো, যদি মানুষ নিরাপদ না থাকে, তবে কোনো উন্নয়নই জনগণের কাছে অর্থবহ হবে না।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করণীয় কয়েকটি দিক এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে—
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা : পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দিতে হবে। কোনো ধরনের দুর্নীতি বা পক্ষপাতিত্ব বরদাশত না করার ঘোষণা শুধু যথেষ্ট নয়; তা বাস্তবে কার্যকর করতে হবে।
অপরাধ দমনে প্রযুক্তির ব্যবহার : সিসিটিভি ক্যামেরা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, সাইবার অপরাধ দমন সেল সক্রিয় করা এবং তথ্যপ্রযুক্তি-ভিত্তিক নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা : নিরাপত্তা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, বরং জনগণেরও দায়িত্ব। এজন্য কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা উচিত।
দ্রুত বিচার ব্যবস্থা : অপরাধের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে যাতে অপরাধীরা শাস্তি পায় এবং অন্যরা ভয় পায়।
সবথেকে বড় কথা হলো, সরকারকে জনগণের কাছে বাস্তব পরিস্থিতি স্বীকার করতে হবে। সমস্যাকে আড়াল করে কিংবা পরিসংখ্যানের ভেতরে বন্দি রেখে কোনো সমাধান আসে না। এখন সময় এসেছে স্বচ্ছতার সঙ্গে স্বীকার করার যে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং তা উন্নয়নের জন্য জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশ নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। এই বাস্তবতায় জনগণের প্রথম ও প্রধান চাহিদা হলো নিরাপত্তা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি সত্যিই জনগণের আস্থা অর্জন করতে চায়, তবে তাদের অগ্রাধিকার হতে হবে অপরাধ দমন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্যথায় সরকারি দাবি ও বাস্তবতার এই বৈপরীত্য জনগণের হতাশা আরও বাড়াবে, যা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য ভয়াবহ সংকট তৈরি করবে।
*লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
