২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিন অং হ্লাইংয়ের সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতিবাদে ইয়াঙ্গুনে আয়োজিত একটি বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন এক নারী
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার এক চরম অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে জনগণের তীব্র প্রতিরোধ—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে দেশটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর অর্থনৈতিক ধসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দ্য ইরাবতি-তে বর্তমান পরিস্থিতির একটি গভীর বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ লিখেছেন মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী সমান্তরাল সরকার—ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের (NUG) উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মো জউ ও
গত শনিবার আমি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সাধারণ মানুষকে শান্তিপূর্ণভাবে ‘নো কিংস’ (রাজতন্ত্র নয়) বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখেছি। মিয়ানমারের বসন্ত বিপ্লবের (Spring Revolution) পক্ষে কাজ করা একজন কূটনীতিক হিসেবে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করার প্রথা সম্পর্কে আমি সচেতন। তবে আমি এটুকু বলতে পারি: আজকের এই আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে, একজন মাত্র ব্যক্তি ভালো বা মন্দ কাজের মাধ্যমে জাতীয় এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বদলে দিতে পারেন, যা কোটি কোটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে।
আমার দেশে, ক্ষমতার প্রতি মোহগ্রস্ত এবং রাষ্ট্রপতি হওয়ার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষায় মত্ত একজন স্বৈরশাসক পুরো দেশটিকে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দিয়েছেন। মাত্র পাঁচ বছর আগে, কোভিডের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও মিয়ানমার সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল এবং একটি গণতান্ত্রিক ও ফেডারেল ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করছিল। কিন্তু এক ব্যক্তির নার্সিসিস্টিক স্বপ্নের কারণে সেই সব কিছু থমকে গেছে।
তারপর থেকে দেশটি একের পর এক মানবসৃষ্ট এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। পূর্ববর্তী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের মতো কার্যকর নেতৃত্ব ছাড়াই আমরা কোভিডের ঢেউ মোকাবিলা করেছি। আমরা ঝড় ও বন্যার সম্মুখীন হয়েছি এবং গত বছর আমাদের দেশের মানুষ ভয়াবহ ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের কবলে পড়েছিল। সেই দুর্যোগে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, গৃহহীন হয়েছে এবং পুরো জনপদ ধ্বংস হয়ে গেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সাহায্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, প্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী জব্দ করে এবং ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, দুর্যোগের রেশ কাটতে না কাটতেই সামরিক বাহিনী ৫৫০টিরও বেশি বিমান ও কামান হামলা চালিয়ে শত শত বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ফেমিন: অ্যান এসে অন এনটাইটেলমেন্ট অ্যান্ড ডিপ্রাইভেশন’-এ যুক্তি দিয়েছেন যে, কোনো কার্যকর গণতন্ত্রে কখনো বড় ধরনের দুর্ভিক্ষ হয়নি। গণতান্ত্রিক সরকারগুলো—যারা নির্বাচন, বিরোধী দল এবং মুক্ত গণমাধ্যমের কাছে দায়বদ্ধ—জনদুর্ভোগ প্রতিরোধে কাজ করতে বাধ্য থাকে।
আমাদের অভিজ্ঞতা করুণভাবে এই সত্যকেই নিশ্চিত করে। ২০০৮ সালে সামরিক শাসনের অধীনে ঘূর্ণিঝড় ‘নার্গিস’ থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ভূমিকম্প পর্যন্ত—মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে শুধুমাত্র গণতন্ত্র এবং দায়বদ্ধ শাসনের অভাবে। বিপরীতে, সামরিক অভ্যুত্থানের আগের গণতান্ত্রিক সরকার কোভিড মহামারি মোকাবিলায় অনেক বেশি দক্ষতা দেখিয়েছিল।
স্বৈরশাসনের পরিণতি শুধু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনৈতিক ধস, সামাজিক বিভাজন, ক্রমবর্ধমান সশস্ত্র সংঘাত এবং জাতিগত বিভেদ—সবই মিন অং হ্লাইংয়ের অপশাসন এবং প্রশাসনিক কাঠামোর অবক্ষয়ের ফল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এখন মিয়ানমারের পরিস্থিতিকে বলকান অঞ্চলের মতো খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার আশঙ্কা এবং একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের (Failed State) বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
এখন নতুন এক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে: জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে এশিয়াজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ছে এবং আমার দেশও এর বাইরে থাকবে না। মিন অং হ্লাইং যখন তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার ব্যক্তিগত স্বপ্নের দিকে এগোচ্ছেন, তখন আরেকটি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ দানা বাঁধছে। আবারও গণতন্ত্র ও সুশাসনের অভাব আমাদের সাধারণ মানুষকে চড়া মূল্য দিতে বাধ্য করবে।
এখানে আমি থমাস জেফারসনের সেই কালজয়ী কথাগুলো স্মরণ করতে চাই, যা তিনি মার্কিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে লিখেছিলেন: “মানুষের সম্মতির ওপর ভিত্তি করেই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই শাসন ক্ষমতা বৈধতা পায়।” জনগণের সেই সম্মতি ছাড়া কোনো শাসকই অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে না।
এই নীতিটি কেবল বিমূর্ত কোনো ধারণা নয়—এটি আজ আমার দেশের রূঢ় বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে। কোনো স্বৈরশাসকই তার জনগণের সম্মতি ছাড়া চিরকাল শাসন করতে পারে না। আর জনগণেরও পূর্ণ অধিকার রয়েছে সেই শাসকদের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করার, যারা গায়ের জোরে শাসন করতে চায়।যতক্ষণ পর্যন্ত শাসিত জনগণ ঐক্যবদ্ধ, সহনশীল এবং স্বাধীনতার অন্বেষণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকবে, ততক্ষণ আমি আত্মবিশ্বাসী যে একটি উজ্জ্বল এবং ন্যায়সঙ্গত ভবিষ্যৎ আবারও ফিরে আসবে।
মো জউ ও , মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী সমান্তরাল সরকার—ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের (NUG) উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী
