ওয়াশিংটন ও তেহরান: পারমাণবিক যুদ্ধের মেঘ কাটিয়ে অবশেষে বড় ধরনের সংঘাত থেকে পিছু হটল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র এক ঘণ্টা আগে মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। এই চুক্তির আওতায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে খুলে দিতে রাজি হয়েছে তেহরান।
গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিধ্বংসী হামলার পর ইরান এই যুদ্ধবিরতিকে তাদের ‘বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তেহরান জানিয়েছে, সংঘাত নিরসনে আগামী শুক্রবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসবে তারা।
ট্রাম্পের হুমকি ও পাকিস্তানের ভূমিকা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে জানান, পাকিস্তানের নেতাদের অনুরোধে তিনি ইরানে ‘বিধ্বংসী হামলা’ স্থগিত করেছেন।
ট্রাম্প লিখেছেন, “ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান যদি অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে সম্মত হয়, তবে আমি দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে সব ধরনের বোমাবর্ষণ ও হামলা স্থগিত রাখতে রাজি আছি।”
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতায় প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি জানান, এই যুদ্ধবিরতি অবিলম্বে কার্যকর হবে। শরিফ আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধের বিষয়েও মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দামে ধস
যুদ্ধবিরতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় ১৭ শতাংশেরও বেশি কমেছে। গত কয়েক সপ্তাহে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় রাজনৈতিক চাপে ছিলেন ট্রাম্প। এই চুক্তির পর বুধবার এশিয়ার শেয়ার বাজারেও বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থান
শান্তি আলোচনার জন্য ইরান ১০ দফার একটি পরিকল্পনা জমা দিয়েছে, যাকে ‘কার্যকর’ বলে বর্ণনা করেছেন ট্রাম্প। তবে ইরান জনসমক্ষে যে দাবিগুলো প্রকাশ করেছে তাতে বলা হয়েছে— দেশটির ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থাকবে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।
ভয়াবহ হুমকির মুখে ইরান
যুদ্ধবিরতির আগে ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর ছিল নজিরবিহীন। তিনি হুমকি দিয়েছিলেন যে, প্রয়োজনে তিনি ইরানের সমস্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করে দেবেন। এমনকি তিনি বলেছিলেন, “আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।” ট্রাম্পের এই চরমপন্থি অবস্থানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পোপ লিও চতুর্দশ।
ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান
যুদ্ধবিরতির ঠিক আগ মুহূর্তেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তাদের হামলায় রেভল্যুশনারি গার্ডের ব্যবহৃত রেললাইন ও সেতু ধ্বংস হয়েছে। তেহরানের একটি সিনাগগ (ইহুদি উপাসনালয়) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিরল দুঃখ প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
অন্যদিকে, গত কয়েক সপ্তাহে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাতার, বাহরাইন ও সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাগদাদে একটি রকেট হামলায় এক শিশুসহ দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আপাতত দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির পথ দেখাবে কি না, তা নিয়ে এখনো সন্দিহান বিশ্লেষকরা।
__বাসস
