ডেস্করিপোর্ট: সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় গঠিত সরকারি তহবিলে ২৫৫ কোটি টাকার বেশি জমা থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রচারের অভাব এবং কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে হাজার হাজার ভুক্তভোগী পরিবার আর্থিক সহায়তার সুফল পাচ্ছে না। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মাত্র ১৪ শতাংশ এবং আহতদের মাত্র ২ শতাংশের কিছু বেশি পরিবার ক্ষতিপূরণ পেতে সক্ষম হয়েছে।
২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় মোটরসাইকেলের সঙ্গে লাকড়িবোঝাই গাড়ির সংঘর্ষে প্রাণ হারান সাংবাদিক মোহাম্মদ ইমরান হোসেন। দুই বছর পার হতে চললেও ইমরানের পরিবার এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। এমনকি ক্ষতিপূরণ তারা আদৌ পাবে কি না, সে বিষয়েও কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি পরিবারটিকে।
ইমরানের মা আয়েশা বেগম বলেন, “ছেলে হারিয়ে আমরা এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে স্বাভাবিক হতে সময় লেগেছে। স্বজনদের সহায়তায় চট্টগ্রামে বিআরটিএ কার্যালয়ে আবেদন করেছি, কিন্তু আমাদের আবেদনের বর্তমান অবস্থা কী তা কেউ জানায়নি। কোথায় খোঁজ নেব, তাও আমাদের জানা নেই।”
আইন বনাম বাস্তবতা
সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এবং ২০২২ সালের বিধিমালা অনুযায়ী, আবেদনের দুই মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণের অর্থ সরাসরি ভুক্তভোগীর ব্যাংক হিসাবে যাওয়ার কথা। তবে মাঠপর্যায়ে এর চিত্র ভিন্ন।
বিধিমালার আওতায় আর্থিক সহায়তার হার:
- নিহত বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা গেলে: ৫ লাখ টাকা।
- গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গহানি হলে: ৩ লাখ টাকা।
- চিকিৎসায় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা না থাকলে: ৩ লাখ টাকা।
- স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা থাকলে: ১ লাখ টাকা।
বিআরটিএ-র পরিসংখ্যান ও বৈষম্য
বিআরটিএ-র হিসাব মতে, ২০২৩ সাল থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার এবং আহত হয়েছেন ২০ হাজার ৪৮৩ জন।
বিপরীতে, ট্রাস্টি বোর্ড এ পর্যন্ত মাত্র ২ হাজার ৬৪১টি চেক বিতরণ করেছে। এর মধ্যে নিহতের পরিবার ২ হাজার ১৯৫ জন এবং আহত মাত্র ৩১৬ জন। গুরুতর আহত হিসেবে সহায়তা পেয়েছেন ১৩০ জন। সব মিলিয়ে ১১৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। বিআরটিএ-র হিসাব বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালুর পর থেকে যত মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, এর মধ্যে মাত্র প্রায় ১৪ শতাংশ ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। আহতদের মধ্যে এই হার মাত্র ২ শতাংশের কিছু বেশি। অথচ বেসরকারি হিসাবে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি।
হয়রানি ও ঘুষের অভিযোগ
ক্ষতিপূরণ পেতে দেড় বছর ধরে ঘুরছেন টাঙ্গাইলের সিরাজ মিয়ার পরিবার। মুদিদোকানি সিরাজ মিয়া ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর অটোরিকশা দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তাঁর ছেলে আনোয়ার হোসেন জানান, বিআরটিএ-র লোক পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি ফোন করে জানান, ১ লাখ টাকা ঘুষ দিলে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ মিলবে। আনোয়ার বলেন, “আমাদের ঘুষ দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাই আর যোগাযোগ করিনি।”
অন্যদিকে, বাগেরহাটের বনি আমিন তাঁর ভাইয়ের মৃত্যুর পর ২০২৪ সালে আবেদন করেও বিআরটিএ কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তাঁর ভাই গোলাম রসুল ছিলেন মাদ্রাসার পরিচ্ছন্নতাকর্মী। মারা যাওয়ার দুই দিন পর গোলাম রসুলের স্ত্রী একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। বনি আমিন বলেন, “দুই বছর ধরে ‘হয়ে যাবে, হচ্ছে’ বলে ঘোরাচ্ছেন বিআরটিএ কর্মকর্তারা। অথচ আমার পরে আবেদন করে কেউ কেউ টাকা পেয়েছেন বলে জেনেছি।”
তহবিলে অলস টাকার পাহাড়
ট্রাস্টি বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্ট পর্যন্ত তহবিলে ২৫৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা জমা আছে। এই তহবিলে মোটরযান মালিকদের চাঁদা, সরকারি অনুদান এবং জরিমানার অর্থ জমা হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব ও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সাইফুল আলম বলেন, “তহবিলে টাকা আছে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এর প্রচার করা দরকার, এমনকি আবেদনটি যাতে সরকারি উদ্যোগে নেওয়া হয়, সেটিও করা যায়।”
জটিল প্রক্রিয়া ও জবাবদিহিতার অভাব
শুরুতে আবেদনের সময়সীমা মাত্র ৩০ দিন থাকায় অনেকেই সুযোগ হারিয়েছেন। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার এটি বাড়িয়ে ৯০ দিন করেছে। আবেদনের পর অনুসন্ধান কমিটি ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ব্যস্ততা এবং বিআরটিএ কর্মকর্তাদের গড়িমসির কারণে প্রতিবেদন জমা দিতে বিলম্ব হয়।
ক্ষতিপূরণের বিষয়ে তদন্তের জন্য ১৪ সদস্যের একটি স্থায়ী কমিটি রয়েছে। বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সামছুল হক এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
“ক্ষতিপূরণটা পেলে দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারের কিছুটা হলেও উপকার হয়। এ টাকা দিতে গড়িমসি কিংবা প্রক্রিয়াগত জটিলতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটা ঠিকভাবে না করতে পারলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।”
একনজরে আর্থিক ও হতাহতের চিত্র:
| খাত | সংখ্যা/পরিমাণ |
| তহবিলে জমা (আগস্ট পর্যন্ত) | ২৫৫.৩৭ কোটি টাকা |
| মোট বিতরণকৃত অর্থ | ১১৬.৮১ কোটি টাকা |
| মোট নিহত (সরকারি হিসেবে) | ১৬,০০০ জন |
| ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন (নিহত পরিবার) | ২,১৯৫টি (১৪%) |
| ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন (আহত) | ৩১৬ জন (২%) |
