ডেস্ক রিপোর্ট: বিদ্যুতের চাহিদা ১৪ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে শুরু হতে যাচ্ছে সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুম। এতে চলতি মাসের শেষ দিকে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সে সময় চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে বেগ পেতে হবে সরকারকে। কারণ দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানির কাছে বিপুল অঙ্কের দেনা রয়ে গেছে। এসব দেনা শোধ না করলে প্রয়োজনের সময় বিদ্যুৎ না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা দেনা ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেনা বেসরকারি খাতের তেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর। এরপরই রয়েছে কয়লাভিত্তিক বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া।
এদিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি পণ্য আমদানি করতে পারছে না বাংলাদেশ। এতে জ্বালানি সংকটে লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ খাত সংস্কারে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি করা হলেও তারা ইউনূস সরকারের বিদায়ের কিছুদিন আগে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। এতে আদানিসহ কয়েকটি চুক্তির অনিয়ম নিয়ে আলোচনা করা হলেও সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমাতে ট্যারিফ রিফর্ম কমিটি করলেও তাদের প্রতিবেদন প্রকাশই করা হয়নি।
তারা আরও বলেন, সব মিলিয়ে দেড় বছর অপচয় করে গেছে বিগত সরকার। যদিও তাদের হাতে সুযোগ ছিল অনেক কিছু করার। এছাড়া হাসিনার সময়ের রেখে যাওয়া আদলেই বিদ্যুৎ খাত পরিচালনা করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এতে বেড়েছে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়। পাশাপাশি বিপিডিবির লোকসান বেড়েছে। ফলে ভর্তুকি বাড়িয়ে তা সামাল দিতে হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানো গেলে তা হতো দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকর।
বিপিডিবির তথ্যমতে, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত সরকারি ও বেসরকারি কেন্দ্রের গ্যাস বিল বকেয়া ছিল ১০ হাজার ৪৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। সে সময় বিপিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর গ্যাস বিল বকেয়া ছিল ১ হাজার ৮৫৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা। আর ভারত থেকে আদানির বিদ্যুৎ আমদানির বিল বকেয়া ছিল ২ হাজার ৯০৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা বা ২৩ কোটি ৬৭ লাখ ডলার।
এদিকে গ্যাস ও ফার্নেস অয়েলচালিত বেসরকারি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর (আইপিপি) বিল ১৯ ফেব্রুয়ারি বকেয়া ছিল ১৬ হাজার ৫১৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। আর দেশি ও যৌথ উদ্যোগের কয়লাভিত্তিক আইপিপিগুলোর বিল বকেয়া ছিল ১০ হাজার ৩২৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা। সে সময় সরকারি মালিনাকাধীন ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিল বকেয়া ছিল ৫ হাজার ৭১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এছাড়া বিদ্যুৎ সঞ্চালনের হুইলিং চার্জ বকেয়া ছিল ২৪০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৬ হাজার ৯৬০ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
বিপুল বকেয়া প্রসঙ্গে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করীম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। শুরু থেকে বকেয়া জমতে জমতে এ অবস্থায় এসেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বিক্রির মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে প্রতি বছর ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। সরকার থেকে ভর্তুকি যা পাওয়া যাচ্ছে সেটা পরিশোধ করা হচ্ছে, বাকিটা জমেছে। এভাবে বকেয়া হতে হতে এ পর্যায়ে এসেছে।
সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বিপিডিবির বকেয়া এক পর্যায়ে তিন মাসে নেমে এসেছিল। তবে ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পর থেকে আর কোনো বিল পরিশোধ করেনি বলেও জানান বেসরকারি উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, এ পরিস্থিতি নতুন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছাকৃত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে কিনা সে সন্দেহের কথাও জানিয়েছেন তারা।
যদিও সাবেক বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেছেন, টাকার বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছাড়ের ওপর নির্ভর করে। এখানে ইচ্ছাকৃত বকেয়া রাখার কোনো ইস্যু নেই। রেভিনিউ সংকটের কারণেই তারা বিল পরিশোধ করতে পারেনি। এখানে ইনটেনশনাল কিছু নেই। এটা টাকার অ্যাভেইলিবিলিটির ওপর নির্ভর করে। বিপিডিবি যখন টাকা পায় তখনই দেয়। ওদের সোর্স হচ্ছে রেভিনিউ ও অর্থবিভাগ থেকে পাওয়া ভর্তুকি।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছে। যদিও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেলে এর অর্ধেকও ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। কারণ বাংলাদেশে মোট সক্ষমতার ৮৮ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে গ্যাস, কয়লা ও তেলের ব্যবহার হয়। এ জ্বালানির বড় অংশই আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে চাহিদা পূরণ করতে হয়। আর তেল ও কয়লা প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়। তবে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার বা ওমান থেকে গ্যাস পাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বাধ্য হয়ে সরকার স্পট মার্কেট থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে স্বল্প পরিসরে এলএনজি আমদানি শুরু করেছে। তবে এ গ্যাস দিয়ে চাহিদার অর্ধেকও মেটানো সম্ভব না।
এ অবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রাথমিক জ্বালানির সংস্থান করে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, এ মাসের শেষ দিকে মূল চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। সে সময় বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে যে পরিমাণ জ্বালানি লাগবে তা সরবরাহ পাওয়াটা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সূত্র: দৈনিক জাতীয় অর্থনীতি
